পলিটিক্যাল মার্কেটিং: জনগণ, ধর্ম ও কবি

 


রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নতুন কিছু নয়।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় গোষ্ঠী, ধর্মানুভূতি এবং এ সংক্রান্ত এজেন্ডা রাজনীতির আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে। একেবারে উন্নত বিশ্ব বলতে যা বোঝায় সে সব দেশেও মাইগ্রেটেড অর্থ্যাৎ অভিবাসী জনগোষ্ঠীর বড়সড় ভূমিকা থাকে নির্বাচনের ফলাফলে। ফলে, নির্বাচনী অঙ্গীকারও সেভাবে ঠিক করা হয়।


"কুইক নোটস" সিরিজের লেখায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মমতা ব্যানার্জীর সাম্প্রতিক কিছু প্রচারণা/বিজ্ঞাপনে নজর দেবো। শেষে রাখবো, কুইক নোটসের কুইক প্রশ্ন।


সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার বেশ আলোচিত হয়েছে।

নির্বাচনের ফলাফল: পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ২১৩ টি আসনে জিতে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরে তৃণমূল কংগ্রেসের সব নির্বাচিত বিধায়করা আবারও মমতা ব্যানার্জীকে পরিষদের দলনেত্রী হিসাবে নির্বাচিত করেছেন। মমতা ব্যানার্জীর রাজনৈতিক উত্থান নিয়ে বিবিসির এ লেখা পড়তে পারেন। 

 


 

তবে নির্বাচনের আগে অভিযোগ এসেছিল - "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবর মাছের তেলে মাছ ভেজেছেন গঙ্গা জলে গঙ্গা পুজো করেছেন। মুসলমানদের খুশি করার জন্য ইমাম ভাতা, মোয়াজ্জেন ভাতা দিয়েছেন আবার যখন লোকসভা ভোটের ফল খারাপ হয়েছে তখন পুরোহিত ভাতা দিয়ে হিন্দুদের সন্তুষ্ট করতে চাইছেন।"

ন্যদিকে মমতার পক্ষের যুক্তি ছিল - "ইমাম ভাতা দেওয়া হয় ওয়াকফ বোর্ড থেকে, যাদের নিজস্ব আয় আছে। ফিরহাদ হাকিম সম্প্রতি বলেছেন, হিন্দুরা যদি এরকম কোনও সংস্থা করেন, পুরোহিত ভাতা দেওয়া সম্ভব। শ্মশানের পুরোহিতদের বিশেষ ভাতা দিতে শুরু করেছে পুরসভা। অভিযোগ, মুসলিমদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যান মমতা ব্যানার্জি। হ্যাঁ, যান। সঙ্গে এই তথ্যটাও বলা যাক, শিখ–‌জৈন–‌বৌদ্ধ–‌খ্রিস্টানদের অনুষ্ঠানেও যান। বলেন, আমি হিন্দু। কিন্তু ধর্ম যার যার, ব্যক্তিগত, সম্প্রীতিই আসল কথা। বিজেপি–‌র কথা শুনে মনে হয়, মমতা মর্মে ‌মর্মে মুসলিমপ্রেমী। সত্যি?‌ ব্যক্তিগতভাবে হিন্দু, অসংখ্য পুজোর উদ্বোধনে যান।"

শ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে এবার বিজেপি এসেছিল তাদের চিরায়ত কৌশল ধর্মকে পুঁজি করে নির্বাচন করতে। নীচু জাতের মানুষের মন জয় করতে বাংলাদেশের ওড়াকান্দিতে গিয়ে নমশূদ্র সমাজের মন্দিরে মাথা ঠেকিয়ে এসেছেন নরেন্দ্র মোদি। সেটা কতোটুকু প্রভাব ফেলেছে মমতা ব্যানার্জীর প্রচার কৌশলে সেটাও প্রশ্ন থেকে যায়। অন্যদিকে, আব্বাসের ধর্মীয় রাজনীতির সঙ্গে লেজুড় হয়ে বামেরা যে নির্বাচন করেছে, সেটাও লক্ষ্যণীয়। তাই কেউ কেউ মনে করেন, নানাভাবে নানান গোষ্ঠী ও জাতির মধ্যে ঢুকে তাদের কাছে টানার যে রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গে শুরু করেছিলেন মমতা, এবারের নির্বাচনে সেটিকে নতুন রূপ দিয়েছেন মোদি।

 

নির্বাচনে জেতার পরে, গত ৩ সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কিছু বিজ্ঞাপনে এবার চোখ বুলাই - 

 

বিজ্ঞাপন ১ (৬ মে ২০২১) । "খেলা হবে, খেলা হবে" চিৎকারে, ধমকে, চমকে নির্বাচনে জিতে মমতা শপথ গ্রহণ করেছেন -

 

বিজ্ঞাপন ২ (৯ মে ২০২১) । রবি ঠাকুরের জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি -


বিজ্ঞাপন ৩ (১৪ মে ২০২১) । সকলকে ঈদ মোবারক -


বিজ্ঞাপন ৪ (১৭ মে ২০২১) । ভ্যাকসিন সংক্রান্ত বার্তা

 

বিজ্ঞাপন ৫ (২৬ মে ২০২১) । শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা


বিজ্ঞাপন ৬ (২৬ মে ২০২১) । কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিবসে শ্রদ্ধার্ঘ্য



এ হলো গত তিন সপ্তাহে মমতার প্রচারণার কিছু উদাহরণ।

উল্লেখ্য, এ সময়ে মমতা 'সকলকে' (শুধু মুসলিমদের নয়, সকলকে) ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। গত বছর দূর্গাপূজার সময়ও মমতার বার্তা দেখা গেছে মহাচতুর্থী থেকে সপ্তমী পর্যন্ত -


বিজ্ঞাপন ৭-১০ । দূর্গাপূজা (২০২০)


 

 


ঈদ, পূজা, এবং বৌদ্ধ পূর্ণিমার পাশাপাশি ২৫ ডিসেম্বরের বড়দিনেও শুভেচ্ছা বাণী প্রচার করেছেন মমতা -

 

বিজ্ঞাপন ১১ (২৫ ডিসেম্বর ২০২০) । বড়দিনের শুভেচ্ছা


 

ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি রবি-নজরুলে সরব থেকেছেন মমতা। জানার ইচ্ছা ছিল, জীবনানন্দের জন্মদিনে কী বলেছিলেন মমতা? সেখানেও সরব -

 

বিজ্ঞাপন ১২ (১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১) । জীবনানন্দের জন্মদিন


পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে প্রচারিত বিজ্ঞাপনগুলো স্রেফ উৎসব উপলক্ষ্য এবং দিবসের বার্তা হলেও, পলিটিক্যাল টার্গেট অডিয়েন্সের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সম্পর্ক স্থাপনে এ বিজ্ঞাপনগুলোর ভূমিকাকে তুচ্ছ করার উপায় নেই। মমতা ব্যানার্জীর ব্র্যান্ড ইমেজ ধরে রাখতে এ বিজ্ঞাপন ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। তবে বার্তার ধারাবাহিকতাও (message consistency) লক্ষণীয়। খুব বেশি ক্রিয়েটিভিটির ধুমধাড়াক্কা নেই, বরং "সিম্পলের মধ্যে গর্জিয়াস" টাইপ ব্যাপার আছে।


ভাষা, ধর্ম, উৎসব এবং সংস্কৃতিতে অনেক মিল থাকলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের প্রচার প্রসারে এমন ধারাবাহিক এবং সঙ্গতিপূর্ণ প্রচারণা চোখে পড়ে না। রাজনৈতিক কর্মসূচীতে, বাণীতে, বক্তৃতায় কবিদের নাম উঠে এলেও মমতার স্টাইলে প্রিন্ট মাধ্যমের প্রচারণা চোখে পড়ে না

রাজনীতি তো সংস্কৃতি থেকে বিযুক্ত বা দূরের বিষয় নয়। তাহলে, কেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতারা প্রধান কবিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এমন বার্তা দেন না? নাকি, কবিদের তেমন বাজারমূল্য নেই বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে?

নেই যে অবশ্য সে কথাও বলা যাবে না। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশী পলিটিকো বিশ্লেষণ হাসি ঠাট্টার পাশাপাশি জ্ঞান-প্রজ্ঞার সীমাবদ্ধতার করুণাও কুড়ায় -



 

ফটো ক্রেডিট:

মমতা ব্যানার্জীর ছবি - দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড 

অন্য সব ছবি - আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে নেয়া

 

 

No comments:

Post a Comment