বিজ্ঞাপনে অপরাধবোধ



"সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে
সেই আমি কেন তোমাকে দুঃখ দিলেম
কেমন করে এত অচেনা হলে তুমি
কীভাবে এত বদলে গেছি এই আমি
বুকেরই সব কষ্ট দু’হাতে সরিয়ে
চলো বদলে যাই...
... তুমি কেন বোঝনা তোমাকে ছাড়া আমি অসহায়
আমার সবটুকু ভালবাসা তোমায় ঘিরে
আমার অপরাধ ছিল যতটুকু তোমার কাছে
তুমি ক্ষমা করে দিও আমায়।"


ইয়ূব বাচ্চুর কালজয়ী গান - চলো বদলে যাই।
অপরাধ স্বীকারপূর্বক প্রেয়সীর প্রতি আকুল আবেদন – তুমি ক্ষমা করে দিও আমায়।
নিজের ভুলের জন্য কতোটা অপরাধবোধে আক্রান্ত হলে এমন করে বলা যায় সেটা প্রশ্নাতীত। প্রেয়সী ক্ষমা করেছিল কিনা কিংবা এই গান শুনে তার মনেও কোনো অপরাধবোধ জন্মেছিল কিনা সেটাও আমাদের জানা  নেই।

তবে, অপরাধবোধ আমাদের জীবনের নিত্য অংশ। নানান কারণে, আমরা অপরাধে ভূগি, অনুতপ্ত হই।

বাংলা সিনেমায় মমতাময়ী মা তার সন্তানকে ডেকে বলছেন “তোর বাবা নেই, আমি সেলাই করে সংসার চালাই, তোর পড়ালেখার খরচ জোগাই, আর তুই পড়ালেখা বাদ দিয়ে সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়াস, এর ওর সাথে মারামারি করিস, আমার কাছে কেবল অভিযোগ আর অভিযোগ...” এই কথা বলে সাদা শাড়ী পরা মা আঁচল মুখে বুঁজে কাঁদতে থাকেন। কিশোর নায়ক তীব্র অপরাধবোধে আক্রান্ত হয়ে দ্বিগুণ চোখের জল নিয়ে মা-কে জড়িয়ে ধরে বলে – “তুমি দুঃখ করো না মা, আমি তোমার স্বপ্ন সত্যি করবো”। এর পরের দৃশ্যে আমরা দেখি, নায়ক বড় হয়েছে, দৌড়ে ঘরে ফিরে মা’কে জড়িয়ে ধরে বলছে – “মা, আমি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছি”।

সিনেমাটিক দৃশ্য বাদ।
খাবার নষ্ট করলে আমাদের মায়েরা কি বলে ওঠেন না – “মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে, আর তুই খাবার নষ্ট করছিস?” হয়তো অপরাধবোধে আক্রান্ত হয়ে আমরা বাকী খাবারটুকু শেষ করি। 

একই রকমভাবে হয়তো সোমালিয়ার দূর্ভিক্ষপীড়িত এলাকায় পানির কষ্টের কথা ভেবে পানির অপচয় কম করি। এমনকী, ব্যক্তিগত সম্পর্কে দাবী দাওয়া আদায়ে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিংয়ের যে চর্চা সেখানে আমরা অনুযোগ-অনুতাপ-অভিযোগে অপরপক্ষকে অপরাধবোধে বিদ্ধ করি না?

সমূহ ধর্মের প্রার্থণা ঘরগুলোতে বক্তারা সমবেত সুধীকে যেভাবে ধর্মের পথে ডাকেন, সেই বয়ানে কি আমাদের কৃতকর্মের জন্য ঈশ্বরের কাছে পাপী-তাপী-অপরাধী-মনে ক্ষমা চেয়ে অনুতপ্ত হওয়ার ব্যাপারটি প্রায়শই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে না? ওঠে তো।
ফলে দেখা যাচ্ছে, নানান কার্যসিদ্ধিতে আমাদের জীবনে অপরাধবোধ বা Guilt-এর একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।

   
ই ভূমিকা প্রতিফলিত হয়েছে বিজ্ঞাপনে।
কিছু বিজ্ঞাপন স্রেফ ইনফরমেশনাল। যেমন, অল্প কথায় বলে দিচ্ছে আমিন জুয়েলার্সের বায়তুল মোকাররমে কোনো শাখা নেই। তবে, চারপাশে এতো এতো কোলাহল (ক্লাটার), শুধু কিছু একটা বললেই হচ্ছে না, ভোক্তার চোখ মন আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না। বলতে হচ্ছে কায়দা করে, নাটকীয়তা করে, গল্পের ছলে, হয়তো আবেগকে স্পর্শ করাই মূল লক্ষ্য। এ কারণেই, বিজ্ঞাপনে নানান রকম অ্যাপিল আমরা দেখি। সেটা হাস্য তামাশা হতে পারে, আনন্দ উল্লাস হতে পারে, বিষ্ময় হতে পারে, জীবন ও যৌনতা হতে পারে। এমনকী আজকের লেখার বিষয় – ‘অপরাধবোধ’ও হতে পারে...

গিল্ট অ্যাপিলের মূল কথা হলো – মানুষকে এটা মনে করিয়ে দেয়া যে, আপনি যা করার তা করছেন না। অর্থ্যাৎ, আপনি আপনার নিজস্ব/সামাজিক মানদন্ড অথবা প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছেন না। এই অপরাধবোধ যেমন একজন ব্যক্তির বিশ্বাস ও কাজকে প্রভাবিত করে, তেমনি একটা পুরো সমাজের আচার বিধিকেও পালটে দিতে পারে। অন্ততঃ সে উদ্দেশ্যে কম্যুনিকেশন ক্যাম্পেইন তৈরি করা যেতে পারে। 

আর এফ এল-এর “দেশ আমার, দোষ আমার” বিজ্ঞাপনটিতে আমরা সেরকম ব্যাপারই দেখি। যানজট, পার্কিং, ময়লা ফেলা; বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের দিকে আঙুল তুলে – কথার চেয়ে কাজের দিকে এবং নিজের ভুলের দিকে নজর দিতে বলা হচ্ছে। যদিও “দেশ আমার” এই দুই শব্দের গর্বিত উচ্চারণের পাশাপাশি “দোষ আমার” উচ্চারণ হয়তো খানিকটা বেশি উচ্চকিত হয়ে গেছে; আরেকটু অপরাধমিশ্রিত নিচু কন্ঠে হলে ভালো মানাতো, তবুও সামাজিক ইস্যুতে অন্যকে দোষারোপ না করে নিজের ভুলের দিকে তাকানোর এই ক্যাম্পেইনে প্রচ্ছন্ন গিল্ট অ্যাপিল আমরা দেখতে পাই। 




সারা বিশ্বে সামাজিক মূল্যবোধে ধ্বস, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য ও পানীয় সংকটের উপর ভিত্তি করে গত দুই দশকে সোশ্যাল ক্যাম্পেইনগুলোতে গিল্ট অ্যাপিলের জোয়ার দেখা গেছে। গিল্ট অ্যাপিল যে শুধু এনজিও তথা অলাভজনক কোম্পানীগুলো করে থাকে তা না। অনেক মুনাফাভিত্তিক কোম্পানী/ব্র্যান্ডও সিএসআর তথা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটিকে ভিত্তি করে গিল্ট অ্যাপিল ব্যবহার করে।


দের আগে আমরা প্রচুর ক্যাম্পেইন দেখতে পাই যেখানে দান-খয়রাতের মাধ্যমে গরীবের মুখে হাসি ফোটানোর কথা বলা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতি বছর শীতের শুরুতে সমাজের সুবিধা বঞ্চিত মানুষের গায়ে শীতের কাপড় তুলে দেয়ার অনেক ক্যাম্পেইনে গিল্ট অ্যাপিল দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে ‘রবি’র “মিশন কম্বল”-এর কথা বলা যেতে পারে। বিজ্ঞাপনটির ভয়েস ওভারে বলা হচ্ছে – “শীত মানে কুয়াশার রোমান্স, ধোঁয়া ওঠা গরম ভাপা পিঠা, লেপের ওম, ছাদের ওপর বার্বিকিউ, মহল্লায় মহল্লায় ঝলমলে ব্যাডমিন্টন আর দোকানে ঝুলে থাকা উইন্টার কালেকশন, এবারের শীতে আপনার প্রস্তুতি কেমন?”



ভয়েস ওভারে শীতের যে প্রস্তুতির কথা আমরা শুনতে পাই, সেটা আমাদের সামর্থ্যবান গোষ্ঠীর শীতযাপনের সাথে অনেক মিলে যায়। কিন্তু, এই বিজ্ঞাপনে আমরা যে দৃশ্যপট দেখতে পাই সেটা ভয়েস ওভারের পুরো বিপরীত। বিজ্ঞাপনের একেবারে প্রথম দৃশ্যে যখন বলা হচ্ছে শীত মানে কুয়াশার রোমান্স, তখন দৃশ্যচিত্রে দেখা যাচ্ছে কুড়িগ্রামের কোনো গ্রামের এক বৃদ্ধা ও শিশুর শীতার্ত জীবন। এর পরের ৫০ সেকেন্ডে ভাপা পিঠা, লেপের ওম, বার্বিকিউ, ব্যাডমিন্টন কিংবা উইন্টার কালেকশন পারতপক্ষে কোনো আনন্দ উদযাপনের দিকে আহবান করে না। বরং সমাজের সামর্থ্যবান এবং সামর্থ্যহীন – এই  দুই শ্রেণীর তীব্র ব্যবধানকেই স্পষ্ট করে। ফলে ৫০ সেকেন্ড পরে যখন – উইন্টার কালেকশন এবং এবারের শীতে আপনার প্রস্তুতি কেমন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে, তখন দৃশ্যে আমরা দেখি কুড়িগ্রামের সেই শিশুর গায়ে ছালা বস্তা দিয়ে সেলাই করা শীতের জামা তুলে দিচ্ছেন প্রপীড়িত বৃদ্ধা। এরপর যখন বলা হয় শীতের প্রকোপে এটাই (ছালা বস্তার জামা) অনেকের কাছে একমাত্র সম্বল, তখন দর্শকের মনে কেবল সামর্থ্যের বৈপরীত্যই আঘাত করে না, বরং নিজের শীতকালীন বিলাসীতার জন্য একরকম অপরাধবোধ কাজ করে। ঠিক ঐ মুহূর্তেই “যোগ দিন রবির মিশন কম্বলে” আহবানটি ব্যক্তি মানসের অপরাধবোধ নিরাময়ের পথও বাতলে দেয়।

ফলে এটা স্পষ্ট যে, গিল্ট অ্যাপিলকেন্দ্রীক বিজ্ঞাপনগুলো মানুষের মনে অপরাধবোধ তৈরি করে, হাল্কা অনুতাপ বা যন্ত্রণা তৈরি করে, কিন্তু চুপ থাকে না। সাথে সাথে কী করতে হবে সেটাও বলে দেয়। এ কারণে, বিজ্ঞাপন বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন – দর্শক পাঠকের মনে অপরাধবোধটাকে স্থায়ী হতে দেয়া যাবে না, বরং ঐ বোধ তৈরির সাথে সাথে নিরাময়ের পন্থাও বলতে হবে, যেটা আমরা রবির মিশন কম্বলে দেখতে পেয়েছি।


০০৭ সালের দিকে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা কর্ডএইড তাদের তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গিল্ট অ্যাপিল কেন্দ্রীক ক্যাম্পেইন প্রচার করে, যেটা সে সময় যথেষ্ট সাড়া ফেলে। 

যেমন এক বিজ্ঞাপনে দেখানো হচ্ছে -
একটা হাত ব্যাগের দাম ৩২ ইউরো, অন্যদিকে কারো কারো ৪ ইউরোতে পুরা সপ্তাহের খাবারের ব্যবস্থা হয়ে যায়।


একই ক্যাম্পেইনের আরেক বিজ্ঞাপনে দেখানো হয় এক গ্লাস বিয়ারের দাম সাড়ে চার ইউরো, অথচ ৫০ লিটার বিশুদ্ধ পানির দাম মাত্র দেড় ইউরো।


বাড়তি বিলাস ত্যাগ করে দুঃখী মানুষের প্রতি সাহায্য বাড়িয়ে দেয়ার ডাক সমৃদ্ধ এসব বিজ্ঞাপন দেখে অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় সে সময়। এমনকী এক যুগ পরেও বিজ্ঞাপনগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার্ড হতে দেখা যায়।

পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষায় সক্রিয় এনজিও গ্রীণপীস ব্রাজিলে একটি ক্যাম্পেইন চালায় যেখানে বলা হচ্ছে আপনার শিশুর চেয়েও দ্রুত বেড়ে উঠছে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা।



সম্ভবতঃ পরিবেশ রক্ষা, বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য সংকট নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোই সবচে’ বেশি গিল্ট অ্যাপিল ভিত্তিক ক্যাম্পেইন তৈরি করে।



এবার আসুন আরও কিছু প্রাসঙ্গিক বিজ্ঞাপন দেখে আসি।

মশাকে রক্ত না নিয়ে যথাযথ মানুষকে রক্ত দানের আহবানঃ


 *****

মাদক বিরোধী ক্যাম্পেইনে বলা হচ্ছে – আপনি ড্রাগ নিয়ে জেলে যাবেন, কিন্তু আসল ভোগান্তি আপনার প্রিয়জনেরঃ 


  *****

সম্মতি ছাড়া যৌনসম্পর্ক (ধর্ষণ) বিরোধী ক্যাম্পেইনঃ


 *****

ড্রাঙ্ক ড্রাইভিং বিরোধী বিজ্ঞাপনঃ

  *****

ধুমপান বিরোধী বিজ্ঞাপনঃ


 
*
ক্ষণীয়, অনেকগুলো বিজ্ঞাপন অপরাধবোধ তৈরি করাতে যতোটা দক্ষতা দেখায়, সেই বোধ থেকে মুক্তি লাভের পথ দেখাতে ততোটা ক্যারিশমাটিক হয় না। 


মানুষ স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তিকর অনুভূতিগুলো এড়িয়ে যেতে চায়। ফলে বিজ্ঞাপনে গিল্ট অ্যাপিলের ব্যবহার সব সময় পাঠক-দর্শকের পছন্দের ব্যাপার না-ও হতে পারে। পাঠক দর্শক গিল্ট অ্যাপিল সমৃদ্ধ বিজ্ঞাপনে বিরক্ত হয়; একবার দেখে আরেকবার দেখার আগ্রহ পায় না।

নিজস্ব বিশ্বাস, চিন্তা চেতনা, দেশপ্রেমের ওপর আঘাত আসলেও জনগণ বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে স্বোচ্চার হয়ে ওঠে।

মানবাধিকার, পরিবেশ প্রতিরক্ষা কিংবা পশু অধিকার রক্ষা নিয়ে আন্দোলন করছে, এমন বেশ কিছু সংস্থার বিজ্ঞাপন মূলতঃ বুমেরাং হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে পেটা (PETA = People for the Ethical Treatment of Animals) নামের সংগঠনটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। 

বিশ্বের অনেক নামীদামী ব্র্যান্ড কুমিরের চামড়া দিয়ে ব্যাগ জুতা বানায়। বলা হচ্ছে – ভিয়েতনামসহ অনেক দেশে জ্যান্ত কুমিরকে ধরে গায়ের চামড়া তুলে ফেলা হয়। কুমির রক্ষার অনেকগুলো ক্যাম্পেইনে কীভাবে জ্যান্ত কুমিরের চামড়া ছিলা হয় তার ভিডিও এবং স্থিরচিত্র আছে। অনেকেই মনে করেন – এসব ছবি ভিডিও কাস্টমারের মনে যতোটা না কুমিরের জন্য সহানুভূতি বা অপরাধবোধ সৃষ্টি করে তার চেয়ে বেশি ক্যাম্পেইনের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি করে। ব্যক্তিগত অভিরুচির কথা চিন্তা করে পেটা’র ক্যাম্পেইনের কোনো ছবি দিলাম না। আগ্রহীরা চাইলে নিজ দায়িত্বে, আবারও বলি – নিজ দায়িত্বে এই লিংকটা ঘুরে আসতে পারেন।

দামী কোট জ্যাকেট এবং পোশাক তৈরিতে ভেড়ার লোম আরেক দামী উপকরণ। অভিযোগ আছে বিশ্বের অনেক দেশে নির্মম ও নির্দয়ভাবে ভেড়ার লোম কাটা হয়। পেটা এ বিষয়েও স্বোচ্চার। “here's the rest of your fur coat” লিখে গুগল সার্চ দিলেই দেখবেন – গিল্ট অ্যাপিলের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির এক ডজন বিজ্ঞাপন। তবে সতর্কতা দিই – বিজ্ঞাপনগুলো অনেকের মনে ডিসগাস্ট ফিলিংসের জন্ম দিতে পারে। এবং ঠিক এ কারণেই, সহানুভূতির বদলে পেটার এই ক্যাম্পেইন অনেক সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে।

একই ইস্যুতে Fur is dead থীমে বানানো একটা টিভিসি ইউএসএ-তে নিষিদ্ধ হয়েছিল ২০০২ সালে। বিজ্ঞাপনটির বক্তব্য যৌক্তিক, কিন্তু স্টোরিলাইনের ভায়োলেন্স বিজ্ঞাপন নীতিতে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে বিবেচিত হয়েছিল।



ক্সফাম নামে যে সংগঠন বিশ্বে দারিদ্র্যের অগমে দুর্গমে নিপীড়িত, বিশেষত ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য ক্যাম্পেইন করে, আফ্রিকায় তাদের একাধিক ক্যাম্পেইন বিতর্কিত হয়েছে। অভিযোগ হচ্ছে – মানুষের সহানুভূতি আদায়ের জন্য অক্সফাম আফ্রিকার হতদরিদ্র ক্লিষ্ট চেহারা নিয়ে স্টেরিওটাইপড বিজ্ঞাপন করে যাচ্ছে। ফলে, বাকী পৃথিবীর কাছে আফ্রিকার ভালো দিকগুলো প্রচারিত হচ্ছে না। 

*
এরকম বহুমাত্রিক জটিলতার কারণে গিল্ট অ্যাপিল অনেক সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়। ব্যক্তির নিজস্ব বিশ্বাস, অনুভূতির পাশাপাশি বক্তব্যের স্পষ্টতার দিকে নজর দিতে হয়।

বে গিল্ট অ্যাপিল কেবল পরিবেশ/পশু রক্ষা, সামাজিক দায়বদ্ধতাকে কেন্দ্র করে হতে পারে তা নয়। অনেক সময় ব্যক্তির নিজস্ব ভোগ বিলাসও অপরাধবোধ তৈরী করে। যেমন, বাজার গবেষণা সংস্থা সাইনোভেট বছর কয়েক আগে ৮১০০ জন মানুষের উপর জরিপ চালায়, যার ৩৩% মানুষ বলেছে – ক্রিসমাস উপলক্ষ্যে তারা খুব দামী (লাক্সারী) কিছু একটা কিনেছে এবং পরে একটা অপরাধবোধে ভুগেছে যে এটা না কিনলেও হতো। ঈদে-পূজা-পার্বনেও আমরা অনেকে এই অপ্রয়োজনীয় খরচে পা দিই এবং অনুতাপে ভূগি। 

আরও সাদামাটা ব্যাপারেও 'অপরাধবোধ' তৈরি হতে পারে। ধরা যাক, একজন ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষ হুট করে মিষ্টি, আইসক্রীম, পায়েশ বা চিনিসহ চা খেয়ে ফেলছেন, এবং দ্রুত সংগোপনে অপরাধবোধে ভুগছেন। এরকরম অপরাধবোধকে কেন্দ্র করেও মার্কেটিং ক্যাম্পেইন হতে পারে। যেমন, গ্লোরিয়া জিন্সের বিজ্ঞাপনটির দিকে তাকাই, যেখানে বলা হচ্ছে সুইট বাট নট সুগারি; গিল্ট ফ্রি ক্যারামেল্যাট।



অস্ট্রেলিয়ার ইন্যাররয়্যাল অনলাইন ফ্যাশন হাউজ বলছে – গিল্ট ফ্রি শপিং। সোজা বাংলায় বললে, আমাদের জিনিস কিনুন, মানসিকভাবে পস্তাবেন না।



লেক্সাস বলছে, দূষণ কম হবে, আপনার অপরাধবোধও কম হবে।



 ***

ব্যক্তিমানসের অপরাধবোধকে বিজ্ঞাপনে একেবারে অন্যমাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল পিটার কিম জুয়েলারী। Make it up to him এবং Make it up to her থীমে দুটি বিজ্ঞাপনের টার্গেট অডিয়েন্স ছিল ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়েসী তরুণ তরুণী। দুটো বিজ্ঞাপনেই দেখা যাচ্ছে – অবৈধ সম্পর্কে ধরা পড়ে, পার্টনারকে পিটার কিম জুয়েলারীর পণ্য উপহার দিয়ে, পাপমোচনের চেষ্টা চলছে।





Make it for her ক্যাম্পেইন সম্পর্কে বিজ্ঞাপনী সংস্থার মুখপাত্ররা বলেন "That target is a guy at the balancing point in his life where he's still young enough to do something stupid or crazy, but he's old enough to know better"।

তাত্ত্বিকভাবে অপরাধবোধের বিভিন্ন প্রকারভেদ আছে (existential, anticipatory, and reactive)। পণ্য, সেবা ও প্রেক্ষাপটের উপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন গিল্টের প্রয়োগ করা হয়। আলোচনায় জটিলতা এড়ানোর জন্য তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আপাততঃ আলাদা করে রাখলাম।

শেষে, আগে বলা একটা কথা আবার বলি - গিল্ট অ্যাপিলকেন্দ্রীক বিজ্ঞাপনগুলো মানুষের মনে অপরাধবোধ তৈরি করে, হাল্কা অনুতাপ বা যন্ত্রণা তৈরি করে। ফলে খুব সম্ভাবনা আছে – পাঠক দর্শক এ জাতীয় বিজ্ঞাপন দেখে বিরক্ত হবে (পেটার ক্ষেত্রে যেমন ঘটেছে)। তাই ঐ অপরাধবোধ তৈরির সাথে সাথে নিরাময়ের পন্থাও কনভিনসিংলি বলতে হবে।


আইয়ূব বাচ্চুর গানে যেমন অপরাধ স্বীকারের পাশাপাশি বলা হয়েছে – “বুকেরই সব কষ্ট দু’হাতে সরিয়ে, চলো বদলে যাই...”





2 comments:

  1. তথ্য ও তত্তবহুল লেখা , ভাল লাগল

    ReplyDelete
    Replies
    1. মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। আমাদের ফেসবুক পেজেও চোখ রাখতে পারেন...

      Delete