ডায়াস্পোরা মার্কেটিং



যখন একটা জনগোষ্ঠী, সংস্কৃতি, ভাষা তার মূল এলাকা ছেড়ে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে যায়, তখন তাকে Diaspora (ডায়াস্পোরা) বলে।

রুটি-রুজি-ভাগ্য-শিক্ষা নানান কারণে বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রতিবছর অন্য দেশে মাইগ্রেট করছে।

নতুন দেশে, নতুন পরিবেশে, প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীদের কাছে দুইটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেঃ ১) তারা নতুন দেশে নতুন পরিবেশে খাপখাওয়ানোর চেষ্টা করে ২) তারা ফেলে আসা নিজের দেশ, জীবনাধারা ভুলতে পারে না।

এক্ষেত্রে পেছনে ফেলে আসা স্বদেশী খাবার, স্বদেশী ব্র্যান্ড ক্ষণে ক্ষণে বুকে চিনচিন ব্যথা জাগায়।

যেমন দেখা গেছে রাঁধুনি মসলার বিজ্ঞাপনে -




০২.
ঠিক এখানেই অনুন্নত দেশের 'লোকাল' ব্র্যান্ডগুলোর সীমানা ছাড়িয়ে 'গ্লোবাল' হওয়ার সুযোগ আসে।
হিসেবটা সহজ - আমার কাস্টমার বিদেশে গেছে, সেখানে সে আমাকে মিস করে, সুতরাং আমিও বিদেশে যাবো।


০৩.
২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউতে লন্ডন বিজনেস স্কুলের নির্মাল্য কুমার এবং দ্য ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনার জন বেনেডিক্ট স্টীনক্যাম্প একটি আর্টিক্যাল লেখেন।

লেখার এক অংশে বাংলাদেশের প্রাণ আরএফএলের সফট ড্রিংকস, স্ন্যাকস, বিস্কিট, কনফেকশনারীজ ও বিভিন্ন মসলার কথা উল্লেখ করে তারা বলেন - বিদেশের বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে প্রাণ তার বিপনন বিস্তৃত করেছে। যেমন, ইস্ট লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেট এলাকায় ৩২% বাসিন্দা বাংলাদেশ থেকে আসা।

প্রাণ এখানেই থেমে থাকেনি। বাংলাদেশীদের পাশাপাশি একই রকম খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানী, নেপালী, শ্রী লংকান মাইগ্র্যান্টদের টার্গেট করে। 'হালাল' ট্যাগিং-এ তারা অন্য মহাদেশের মুসলমান কাস্টমারদের কাছাকাছিও চলে যায়। এভাবে বাংলাদেশের প্রাণ ব্রিটেনের গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে, মূলধারার সুপারমার্কেটে বিপননের ব্যবস্থা করে ব্রিটেনে নিজের জায়গা করে নেয়ার চেষ্টা করে।

মধ্যপ্রাচ্যে প্রাণে বিজ্ঞাপনের ভাষা পাল্টেছে -




০৪.
ঢাকায় বার্গার কিং-এর আগমনে অনেককে হা-হুতাশ করতে দেখলাম।
কেন বাংলাদেশের মামা হালিম, কাচ্চি বিরানী কিংবা মোস্তাকিমের চাপ বিদেশে বিখ্যাত হতে পারলো না, কেন আমরা নান্নার বিরিয়ানী নিয়ে চেক-ইন সেলফি দেই না - ইত্যাদি ইত্যাদি।
এসব ক্ষোভ প্রকাশে ব্যাপক আবেগ আছে, বাস্তবতা নেই।

বার্গার কিং ঢাকায় হুট করে চলে আসেনি।

আসার আগে ওরা বাজার যাচাই বাছাই করেছে। ওরা ১৯৯৬ সালে না এসে ২০১৬ সালে এসেছে। আসার আগে হিসাব করে দেখেছে - ঢাকায় বার্গার কিং খাওয়ার মতো মন ও মানিব্যাগওলা ভোক্তা সমাজ তৈরি হয়েছে। এই ভোক্তারা এর মধ্যে কেএফসির মুরগির ঠ্যাং এর হাড্ডি চিবিয়ে, পিজ্জা হাটে ঠং ঘন্টা বাজিয়ে, গ্লোরিয়া জিন্সে আড়াইশ' টাকার কফিতে চুমুক দিয়ে ফেসবুকে "ফিলিং বোরড ইন ঢাকা" স্ট্যাটাস দিয়েছে। এবার এদের মুখে বার্গার কিং-এর হুপার পুরে দেয়া যাক। এরা নিজেরাই আধখাওয়া বার্গারের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে "হ্যাপিনেস ইজ..." স্ট্যাটাস দেবে।


০৫.
প্রাণ বুঝেছে, বার্গার কিং'ও বুঝেছে।
বাজার বোঝাটা জরুরী। বেশ কঠিন, তবে অসাধ্য নয়।
অনেক কোম্পানী তাদের "মার্কেটিং রিসার্চ" সেকশনের নাম বদলে "মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড প্ল্যানিং" করেছে।

বাজার অনুসন্ধান মোটেও "ও প্রিয়া তুমি কোথায়" গাওয়া নয়।

-
[ফেসবুকে সংক্ষিপ্ত নোটাকারে প্রকাশিত হয়েছিল ১১ ডিসেম্বর ২০১৬ সালে। বিজ্ঞামনে আগামীতে ডায়াস্পোরা মার্কেটিং নিয়ে বিষদ লেখার ইচ্ছা আছে]

No comments:

Post a Comment