ফিলিপ কটলারের দুঃসাহসিক অভিযান

আধুনিক মার্কেটিংয়ের জনক ফিলিপ কটলারের আত্মজীবনী My Adventures in Marketing: The Autobiography of Philip Kotler প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালে।

সে বছরই  বইটির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা কটলার ছাপান Journal of Historical Research in Marketing-এ। ঐ লেখার বাংলা রূপান্তর বিজ্ঞামনের এ পোস্ট।

যারা মার্কেটিংয়ে পড়েছেন, কাজ করেছেন, ফিলিপ কটলারের নাম শুনেছেন, তার লেখা বই পড়েছেন তারা এ লেখা থেকে বেশ কিছু নতুন তথ্য পেতে পারেন। যারা মার্কেটিংয়ে পড়েননি, তারাও লেখাটি থেকে নতুন কিছু জানবেন বলে আশা রাখছি।

মূল ইংরেজী লেখার মতো করেই বাংলা রূপান্তরে আত্মকথন রাখা হয়েছে।

 

আমার জন্ম শিকাগো, ইলিনয়ে; ২৭ মে ১৯৩১।

আমার বাবা মরিস কটলার এবং মা বেইটি কটলার; দুজনেরই জন্ম রাশিয়ায়। তারা আলাদা আলাদাভাবে আমেরিকায় আসেন, শিকাগোতে পরিচয় হয়; এবং বিয়ে করেন।

আমরা তিন ভাই। আমি সবার বড়। মেজো ভাই মিল্টন আমার চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট। ছোট ভাই নেইল ১০ বছরের ছোট।

মিল্টন এখন ওয়াশিংটনে থাকে। তবে বেশিরভাগ সময় আমেরিকা-চায়নায় আসা যাওয়ার মধ্যে থাকে। চায়নায় ১ম সারির এক মার্কেটিং রিসার্চ এবং কনসাল্ট্যান্সি ফার্ম চালায় মিল্টন।

ছোটভাই নেইল ছিল ইতিহাসের গবেষক। ২০১১ সালে মারা গেছে সে।

 

পড়ালেখা

শৈশবে আমার সুপ্ত ইচ্ছা ছিল হয় অ্যাকাউন্ট্যান্ট হবো, নয়তো ইয়ার।

শিকাগোর ডিপল ইউনিভার্সিটিতে স্কলারশীপ পেয়ে ভর্তি হলাম। বছরখানেক পরেই মন বদলালামস্কলারশীপসহ ভর্তি হলাম ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর স্বনামধন্য ইকোনোমিকস ডিপার্টমেন্টে। আমার শিক্ষক ছিলেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিড্ম্যান।

অর্থনীতিতে এম. পাশ করার পরে ওয়েস্টিংহাউজ ফেলোশীপ নিয়ে অর্থনীতিতেই পিএইচডি শুরু করি এমআইটি-তে। আমার সুপারভাইজর ছিলেন প্রফেসর পল স্যামুয়েলশন এবং রবার্ট সোলৌ; দুজনেই অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী।

১৯৫৬ সালে আমি পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করি। অবশ্য এর পরে আরও ২০টি সম্মানসূচক ডিগ্রি পেয়েছি।

 

প্রেম ও বিয়ে

এমআইটি-তে পড়ার সময় ন্যান্সি কেল্যামের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। হার্ভার্ডে আন্ডারগ্র্যাডের ছাত্রী ছিল সে। ভালোলাগা থেকে ভালোবাসা এবং বিয়ে। তখনো দুজনের পড়ালেখা শেষ হয়নি। পরে অবশ্য ন্যান্সি ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতে ক্রেডিট ট্রান্সফার করেছে।

সোশ্যাল সাইকোলজি এবং অ্যানথ্রপোলজি নিয়ে জানার বিশেষ আগ্রহে আমিও ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতে সোশ্যাল সায়েন্সের বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি হলাম। পাশাপাশি রুজভেল্ট ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলাম। সেখানে দুজন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো; প্রফেসর অ্যাবা লের্নার এবং ওয়ালটার ভিসকফ। অর্থনীতি সম্পর্কে আমার ভাবনা এবং দৃষ্টিভঙ্গির জগতে দুজন বিশাল প্রভাব ফেলেছিলেন।

 

হার্ভার্ডে ফোর্ড ফাউন্ডেশন প্রোগ্রাম

১৯৫৯ সাল।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোর্ড ফাউন্ডেশন প্রোগ্রামের আওতায় উচ্চতর গণিত বিষয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলাম। সঙ্গে ছিলেন আরও ৫৯জন অর্থনীতিবিদ এবং বিজনেস স্কুল প্রফেসর। এক বছর মেয়াদী প্রশিক্ষণ।

সেখানে বেশ কয়েকজন প্রাজ্ঞ মার্কেটিং প্রফেসর এবং গণিতবিদের সঙ্গে আমার আলাপের এবং জানাশোনার সুযোগ হয়েছিল। সময়ে আমি বেশকিছু ম্যাথমেটিক্যাল ফর্মূলা তৈরি করেছিলাম যেগুলো দিয়ে মার্কেটিংয়ের সমস্যা সমাধান করা যেতো। এই মডেলগুলোর প্রয়োগ নিয়ে ১৯৭২ সালে আমি বই প্রকাশ করি – Marketing Decision Making: A Model-Building Approach.

 

নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি: ইকনোমিকস নাকি মার্কেটিং?

ফোর্ড ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম শেষ হওয়ার অল্প কিছুদিন পরে, প্রফেসর ডোনাল্ড জ্যাকব আমার কাছে জানতে চান আমি নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির বিজনেস স্কুলে (পরে নাম হয়দ্য কেলগ স্কুল অব ম্যনেজমেন্ট) পড়াতে আগ্রহী কিনা। উল্লেখ্য ডোনাল্ডও আমার সঙ্গে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রামে ছিলেন। ডোনাল্ড প্রস্তাব দেনচাইলে আমি ইকোনোমিকস বা মার্কেটিং দুটির যে কোনো একটি পড়াতে পারি।

আমি মার্কেটিংকে বেছে নিলাম, কারণতখন মার্কেটিংয়ে তত্ত্ব এবং কাঠামোর ঘাটতি ছিল।

১৯৬২ সালে কেলগে স্কুল অব ম্যানেজমেন্টে যোগ দিলাম। সেখানকার মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে সেসময় সেরা সেরা সব প্রফেসর ছিলেন। আমার একবছর আগেই যোগ দিয়েছেন সিডনী লেভী। মার্কেটিং বিষয়ে আমার চিন্তাভাবনায় সিডনীর প্রভাব ছিল। পরের বছর আমাদের বিভাগে যোগ দেন জেরাল্ড জটম্যান। জেরাল্ড এবং আমার বোঝাপড়া ছিল চমৎকার। আমরা দুজনে মিলে পরেসোশ্যাল মার্কেটিংধারণার সূচনা করি।

 

প্রসঙ্গ - মার্কেটিং টেক্সটবুক

ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে দেখিমার্কেটিং টেক্সট বইয়ের যাত্রা শুরু ১৯০৫ সালের দিকে।  

দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আমার নজরে আসে

) প্রথমদিকের মার্কেটিং বইগুলো লিখেছিলেন অর্থনীতিতে পিএইচডি করা লোকজন। ভোক্তা উদ্যোক্তা এবং মধ্যসত্ত্বভোগী; এরা সবাই যৌক্তিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয় এমন প্রচলিত অর্থনৈতিক তত্ত্বের ওপর এসব অর্থনীতিবিদেরা সন্তুষ্ট ছিলেন না। তত্ত্বের বাইরে গিয়ে এসব বই-লেখক বোঝার চেষ্টা করেছিলেনবাস্তব বাজারে লোকজন সিদ্ধান্ত কীভাবে নেয়। দাম একই থাকার পরেও বিজ্ঞাপন কীভাবে বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছিল সেসব নিয়ে তারা বিস্তারিত জানার জানানোর চেষ্টা করেন। অর্থনীতিবিদেরা সচরাচর এসব বিষয়কে এড়িয়ে যেতেন।

) বাজার ব্যবস্থায় ক্রেতা-বিক্রেতার কাজকর্ম বর্ণনা করার মধ্যেই সে সময়কার মার্কেটিং টেক্সট বইগুলো সীমিত ছিল। একজন পাইকার বা খুচরা বিক্রেতা কী করবেনসেসব পরামর্শ ভর্তি থাকতো পাতায় পাতায়। কিন্তু, দূর্ভাগ্যজনকভাবে, এসব পরামর্শ ছিল কেবল অনুমাননির্ভর, গবেষণাভিত্তিক নয়।

 

মার্কেটিং বিষয়ে ছাত্রছাত্রী এবং পেশাজীবিদের পড়ানোই ছিল আমার প্রথম ভালোবাসা।

ক্লাসে পড়াতে গিয়ে ক্রমান্বয়ে আমি আমার নিজের লেখা মার্কেটিং বিষয়ক বইয়ের বিষয়বস্তুগুলো গুছিয়ে নিচ্ছিলাম। জ্ঞানের চারটি শাখা থেকে আমি মার্কেটিংয়ের তত্ত্ব প্রয়োগের সংমিশ্রণ করি। শাখাগুলো হলোকনজ্যুমার সাইকোলজি, অর্গানাইজেশনাল বিহেভিওর থিয়রি, ইকনোমিকস এবং ম্যাথম্যাটিকস।

১৯৬৭ সালে আমি Marketing Management:Analysis, Planning and Control বইটি প্রকাশ করি। আমার ধারণা ছিলমার্কেটিংয়ের প্রফেসররা যে রকম বই চাচ্ছেন তার ধারে কাছেও আমার বইটি যাবে না।

আশ্চর্য্যজনকভাবে, সারা বিশ্বজুড়ে বইটির ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা চাহিদা তৈরি হলো। ২০১৬ সালে বইটির ১৫তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়। একটা ব্যাপার ভেবে আনন্দ পাই যে, স্যামুয়েলসনের বিখ্যাত ইকনোমিকস টেক্সটবুক দশম সংস্করণে থেমেছিল। অথচ আমার মার্কেটিং টেক্সট বইটি এখনো নতুন সংস্করণে প্রকাশিত হচ্ছে।

মার্কেটিং ম্যানেজমেন্ট বইটি মূলতঃ বিশ্বের সেরা এমবিএ প্রোগ্রামের জন্য লেখা হয়েছিল।

আন্ডারগ্র্যাডের ছাত্রছাত্রীদের জন্য আরো সরল এবং সহজ বর্ণনার বইয়ের প্রয়োজন দেখা দিল। কারণেই ১৯৮০ সালে Principles of Marketing বইটি প্রকাশ করি। ২০১৬ সালে বইয়ের ১৬তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। একই সময়ে জেনারেল আন্ডারগ্র্যাড এবং বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য ১৯৮৪ সালে Marketing: An Introduction বইটি প্রকাশ করি; ২০১৬ সালে বইটির ১৩তম সংস্করণ চলছে।

বইগুলোর জনপ্রিয়তার কারণে ইতালী, সুইডেন, ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেনসহ নানান দেশে পড়ানোর আমন্ত্রণ পেলাম। চল্লিশ বছর ধরে নানান দেশে পড়ানোর সুবাদে একটি বিষয় আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠলো, তা হলোমার্কেটিং সম্পর্কে বিশ্বের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জানাশোনা একেবারেই কম।

প্রচুর সংখ্যক বিক্রয়কর্মী থাকবে আর বিজ্ঞাপনের পেছনে প্রচুর খরচ হবে; এটাই ছিল সে সময়ের মার্কেটিং।

আমার লেখা বইগুলো পড়ে সে সময়ের ব্যবসায়ীরা 4P (Product, Price, Place, Promotion) এবং STP (Segmentation Targeting, Positioning) নিয়ে জানতে পারছে।

সময়ের পরিক্রমায় একক সত্ত্বা হিসেবেব্র্যান্ডিংএর গুরুত্বও ব্যবসায়ীরা বুঝতে পারলো। কেবল নাম আর লোগোর বাইরেও যে ব্র্যান্ডিং নিয়ে অনেক কিছু জানার আছে, করার আছে; সে বিষয়টি ব্যবসা মালিকদের কাছে স্পষ্ট হলো।

মার্কেটিংয়ের অন্যান্য কনসেপ্ট, যেমনওয়ান-টু-ওয়ান মার্কেটিং, কাস্টোমাইজেশন, ডিফারেনশিয়েশন নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়লো। পরবর্তীতে যখন কম্পিউটার এলো, ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোন সহজলভ্য হলো, মোবাইল অ্যাপের প্রসার ঘটলো, তখন মার্কেটিং এবং কম্পিটিশনের ডিজিটাল ফরম্যাট নিয়েও চারপাশে শোরগোল শুরু হলো।

এই পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গিয়ে আমার লেখা বইগুলোর নিত্য নতুন সংস্করণ আনতে হলো প্রতি দুই-তিন বছর পরপর। সময়ে আরও নতুন কিছু মার্কেটিং বইয়ের সহযোগী লেখক হিসেবেও নিজেকে সম্পৃক্ত করলাম।

 

অন্যান্য বিষয়ে বই এবং গবেষণা

মার্কেটিং বিষয়ে দিনদিন আমার আগ্রহ বাড়তে থাকে। মার্কেটিং-এর শাখা প্রশাখা বিস্তৃত হয়েছে; সেসব বিষয়ে আমার বই এবং গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।

 

Place marketing

সেবা এবং পণ্যের পাশাপাশি শহরেরও যে মার্কেটিং হতে পারে; সে ধারণাটি অনেকের স্পষ্ট ছিল না। অনেক শহর নতুন নতুন ট্যুরিস্ট চাইলো, বিদেশী বিনিয়োগ চাইলো, শিল্প প্রতিষ্ঠান উৎপাদন চাইলো। সেখানেও তীব্র প্রতিযোগিতায়। এই প্রতিযোগিতায় একটি শহর কীভাবে অন্যদের চেয়ে অনন্য হতে পারে, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেসেসব নিয়ে ১৯৯৩ সালে আমি প্রকাশ করি Marketing Places: Attracting Investment, Industry and Tourism to Cities, States, and Nations বইটি পরে এশিয়া, ইউরোপ এবং সাউথ অ্যামেরিকার বিভিন্ন শহরের প্রেক্ষাপটে নতুন নতুন সংস্করণে প্রকাশিত হয়।

 

Atmospherics

বিষয়ে মাত্র একটি লেখাই আমি লিখেছি। একজন মানুষের আচরণ, সিদ্ধান্ত এবং সার্বিক ব্যবহারে পারিপাশ্বিকতার প্রভাব কেমন? বিষয়টি আমাকে বেশ ভাবিয়েছে। দোকানের সাজগোজ কেমন হলে ক্রেতারা আকৃষ্ট হবে? একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চেম্বারের ফার্ণিচার-দেয়াল কেমন হলে রোগীরা নিরাপদ বোধ করবে, নিজের মনের কথা ডাক্তারকে খুলে বলবেএসব নিয়েই ছিল আমার লেখা। বেশ আলোচিত এবং প্রশংসিত হয়েছিল লেখাটি।

 

Demarketing

১৯৮০র দশকে ক্যালিফোর্নিয়ায় তীব্র পানি সংকট ছিল। সে সময়ে সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হলোগ্রামের কৃষক এবং শহরের নাগরিকেরা কতটুকু পানির ভাগ ভাটোয়ারা পাবে। মাথাপিঁছু বরাদ্দের পাশাপাশি পানির ব্যবহার কীভাবে কমানো যায় সেটা নিয়ে বেশ আলাপ আলোচনা হচ্ছিল। ১৯৭১ সালে প্রফেসর লেভী এবং আমি Demarketing, Yes Demarketing লেখাটি প্রকাশ করি। বেশ কিছু পণ্যের সাপ্লাই ছিল কম, চাহিদা ছিল বেশি; আবার অপচয়ও হচ্ছিলসেসব পণ্যের ডিমার্কেটিং কীভাবে করা যায় সে বিষয়ে আমরা পরামর্শ দিচ্ছিলাম। যেমন, পণ্যের দাম বাড়াতে হবে, পণ্যকে কম আকর্ষণীয় করতে হবে, পণ্যকে হাতে নাগালের বাইরে নিয়ে যেতে হবে; এবং বিজ্ঞাপন দেয়া যাবে নাবিজ্ঞাপন দিলেও অনুৎসাহ সৃষ্টিকারী বার্তা দিতে হবে।

 

Social Marketing

“Can you sell brotherhood like you sell soap?” শিরোনামের একটি লেখা আমার এবং জেরাল্ড জল্টম্যানের নজরে আসে। আমরা দুজনেই ভাবতে থাকিমার্কেটিংয়েরকলকব্জাদিয়ে একদিকে যেমন ভোক্তাদের কোনো কিছু কিনতে উৎসাহী করা যায়, তেমনি কোনো আচরণ থেকে বিরতও রাখা যেতে পারে। যেমন, আমরা স্বাস্থ্যহানীর দিক উল্লেখ করে ধুমপান থেকে মানুষকে বিরত থাকতে বলতে পারি। পারিবারিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য পরিবার পরিকল্পনার কথা বলতে পারি। এইচআইভি/এইডস থেকে নিরাপদ থাকতে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ থেকে দূরে থাকতে বলতে পারি। নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার জন্য উৎসাহ দিয়ে মার্কেটিং ক্যাম্পেইনও সাজানো যেতে পারে। আমরা এর নাম দিলামসোশ্যাল মার্কেটিং। পরবর্তীতে ২০০২ সালে ন্যান্সি লীর সঙ্গে যৌথভাবে আমি Social Marketing: Improving the Quality of Life বইটি প্রকাশ করি। ২০১৬ সালে এর পঞ্চম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।

 

Marketing and society

যে সব কোম্পানী মুনাফা অর্জনের বাইরেও অন্য কিছু করছিল, সে সব কোম্পানীর প্রতি আমার বিশেষ আগ্রহ ছিল। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম, মুনাফার বাইরে জনগণ এবং ধরিত্রীর প্রতি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আছে। ন্যান্সি এবং আমি ৪৫টি কোম্পানী নিয়ে গবেষণা করলাম, জানতে চাইলামসামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে তারা কী কী করে। অনেকগুলো কোম্পানী নিজেদের লক্ষ্য উদ্দেশ্যের সঙ্গে সমন্বয় রেখে বিভিন্ন সামাজিক কাজে জড়িত ছিল। অ্যাভনের (Avon) কথা বলা যেতে পারে। অ্যাভনের ভোক্তারা মূলতঃ মহিলা। তাই, মহিলাদের ব্রেস্ট ক্যান্সারের চিকিৎসা এবং গবেষণার পেছনে অ্যাভন অনেক টাকা পয়সা খরচ করছিল। গবেষণার ফলাফল নিয়ে ২০০৫ সালে আমরা প্রকাশ করি Corporate Social Responsibility: Doing the Most Good for Your Company and Your Cause

 

Cultural marketing

শিল্প-সংস্কৃতির জগত নিয়ে আমার সব সময় যথেষ্ঠ আগ্রহ ছিল। ১৯৯৮ সালে আমার ভাই নেইল আর আমি মিলে লিখেছিলাম Museum Strategy and Marketing: Designing Missions, Building Audiences, Generating Revenue and Resources একটি জাদুঘর কীভাবে নিজেকে আকর্ষনীয় করতে তুলতে পারে, পরিদর্শক এবং পৃষ্ঠপোষক বাড়াতে পারে; সেসব বিষয়ে মার্কেটিংয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে নানান ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আমরা করেছিলাম। সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন পারফর্মিং গ্রুপ কীভাবে বেশি বেশি দর্শক টানতে পারে, আর্থিকভাবে স্বচ্ছল থাকতে পারে সেসব নিয়ে জোয়ান শেফের সঙ্গে মিলে ১৯৯৭ সালে লিখেছিলাম Standing Room Only: Strategies for Marketing the Performing Arts এখানেই শেষ নয়। চার্চ এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কীভাবে সদস্য এবং অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়াতে পারে তা নিয়ে ২০০৯ সালে বই লিখেছিলাম, নাম - Building Strong Congregations (2009).

 

Marketing 3.0 and 4.0

পড়ালেখার বিষয় হিসেবে মার্কেটিংকে ক্রমান্বয়ে পণ্য (product) থেকে ভোক্তার (customer) দিকে এবং ভোক্তা থেকে চর্যার (caring) দিকে নজর দিতে হয়েছে। তিনটি পর্যায় নিয়ে ২০১০ সালে Marketing 3.0 বইটি প্রকাশ করি। সঙ্গে ছিলেন দুই এশিয়ান সহযোগী লেখক। ২০১০ এর পরে ডিজিটাল বিপ্লবের কারণে কোম্পানীগুলোকে তাদের ভাবনা এবং কাজকর্মকে ডিজিটাল জগতের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়েছে। ডিজিটালাইজেশনের দিকটি যোগ করে ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয় Marketing 4.0


 

International marketing

ব্যাপক বিদেশ ভ্রমণ এবং বিভিন্ন দেশে পড়ানোর সুবাদে আমি জানতে পারিমার্কেটিং কীভাবে দেশে দেশে নানান রূপ ধারণ করে। পণ্য এবং সেবার মার্কেটিং দেশ ভিত্তিতে কীভাবে ভিন্ন হয়; এবং কীভাবে বিদেশে প্রতিযোগিতা সামাল দেয়া যায়।

ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটিংয়ের বিভিন্ন সমস্যা এবং সমাধান প্রসঙ্গে আমি এবং আমার ভাই মিল্টন মিলে দুইটি বই লিখি। ২০১৩ সালে প্রকাশিত In Market Your Way to Growth: 8 Ways to Win বইটিতে আমরা ব্যবসা প্রসারের ৮টি উপায়ের সুবিধা অসুবিধা নিয়ে লিখি। পরে ২০১৫ সালে Winning GlobalMarkets: How Businesses Invest and Prosper in the World’s High Growth Cities বইটিতে আমরা ক্রমবর্ধমানশীল মেগাসিটির গুরুত্ব নিয়ে লিখি। পৃথিবীতে অনেক দেশ আছে, যাদের কিছু মেগাসিটি সামগ্রিক দেশের তুলনায় দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকে। এসব মেগাসিটিতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব; এটাই ছিল আমাদের দ্বিতীয় বইয়ের মূল বক্তব্য।

 

The impact of capitalism and democracy

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমি খেয়াল করেছিভোক্তাদের আয় রোজগার একপেশে হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে উৎপাদনে, এবং ভোগে। আমেরিকার ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পদ এবং আয়ের বিশাল বৈষম্য তৈরি করছে। ফলে, ব্যাপক সংখ্যক সুরৌম্য প্রাসাদ তৈরি হচ্ছে, প্রাইভেট সুইমিং পুল থাকছে; কিন্তু কম দামের পাবলিক হাউজিং হচ্ছে না, পাবলিক সুইমিং পুলের সংখ্যাও নগণ্য। প্রকৃত মজুরীর বিচারে আমেরিকার কর্মীরা ১৫ বছর আগের চেয়ে এখন কম আয় করছে। কলকারখানার সংখ্যা কমেছে, কম বেতনের সেবা খাত বেড়েছে। বেকারত্বের হার ১৫% আঁটকে আছে অনেক দিন। অথচ আয়ের দিক থেকে পকেট ভরছে কোম্পানীদের সিইও-দের, বিনোদন এবং ক্রীড়া তারকাদের, এবং ধনী ব্যক্তিদের।

ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা কেমন করছে? একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে প্রশ্নের দিকে আমি সুগভীর নজর দিতে চেয়েছি। সমাজের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের নিরীখে আমি ১৪টি সমস্যা চিহ্নিত করেছি। বিষয় নিয়ে লেখা আমার বইতের নাম Confronting Capitalism: Real Solutions for a Troubled Economic System প্রকাশিত হয়েছে ২০১৫ সালে।

 

প্রসঙ্গ বাংলাদেশ

২০১২ সালে আমি বাংলাদেশে ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং সামিট আয়োজন করি। বাংলাদেশে মার্কেটিং ব্যবসা কার্যকারিতা কীভাবে বাড়ানো যায় সে বিষয়ে শিক্ষক এবং পেশাজীবিদের নানান পরামর্শ দেন বিভিন্ন দেশের ২০জনেরও বেশি মার্কেটিং এক্সপার্ট।

বাংলাদেশে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং সামিট এতোই সফল ছিল যে এর পরের বছরগুলোতে একের পর এক সামিট আয়োজন করতে হয়েছে কোয়ালালামপুরে এবং টোকিওতে। সামিটে আগত বক্তারা মার্কেটিং এবং ব্যবসায়ের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা কীভাবে সামাল দিতে হয়, কোন ক্ষেত্রে কোন স্ট্র্যাটেজি নিতে হয়ে সেসব নিয়ে পরামর্শ দেন। আমার ইচ্ছা আছে, প্রতি বছর নতুন নতুন দেশে ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং সামিট অনুষ্ঠিত হবে।

 ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিতে আমার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৬ সালে আমাকে নিয়ে বিশেষ ডাকটিকিট প্রকাশের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ান সরকার আমাকে সম্মান জানায়।


২০১০ সালে হারমাভান কার্তাজায়া এবং আমি বিশ্বের প্রথম মার্কেটিং মিউজিয়াম স্থাপনের উদ্যোগ নিই। ইন্দোনেশিয়ার তিন রাজপূত্র আমাদের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে মিউজিয়ামের জন্য জমি দান করে। ২০১২ সালে মিউজিয়ামটির উদ্বোধন হয়। মিউজিয়াম দেখতে আসা লোকজন এক রুমে একেকজন সফল মার্কেটিং গুরুর, যেমন স্টিভ জবস, ওয়াল্ট ডিজনী, রিচার্ড ব্র্যানসনের, জীবন এবং কাজ সম্পর্কে জানতে পারে। পরের অংশে তারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ব্র্যান্ডগুলোর সাফল্যের ইতিহাস শুনতে পায়। ইতিহাসের নির্বাচিত সেরা বিজ্ঞাপনগুলোও তারা দেখতে পায়।

 


পরিশিষ্ট

মার্কেটিংয়ের জগতে আমার প্রায় অর্ধশত বছর পার হয়েছে।

মার্কেটিংয়ের নানান তত্ত্ব এবং ধারণা নিয়ে বই লেখা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পড়ানোর পাশাপাশি আমি সরকারী এবং বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য পরামর্শক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি।

শারীরিকভাবে এখনো সুস্থ থাকাটা আমার জন্য সৌভাগ্যের। নতুন বিষয় জানার এবং নতুন কিছু করার ব্যাপারে এখনো আমার আগ্রহ অসীম।

অবসর গ্রহণের কোনো ইচ্ছা আমার নেই 


***

তথ্যসূত্র

Kotler, P. (2017), "Philip Kotler: some of my adventures in marketing", Journal of Historical Research in Marketing, Vol. 9 No. 2, pp. 203-208. https://doi.org/10.1108/JHRM-11-2016-0027

No comments:

Post a Comment